১,৪৭,৫৭০ - বাংলাদেশের আয়তন, নাকি ক্ষেত্রফল?
"বাংলাদেশের
আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার " - একথা আমরা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে
ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি। কিন্তু এই তথ্য পড়ার পর আপনার মনে হয়তো এই প্রশ্ন
উঁকি দিয়েছে, "আচ্ছা, দেশের ভূমির পরিমাপকে আয়তন না বলে ক্ষেত্রফল বলা
হচ্ছে কেন?" এই প্রশ্নরই উত্তর পেয়ে যাবেন আপনি এই লেখায়।
প্রথমেই
আমাদের জানা দরকার, আয়তন আর ক্ষেত্রফলের মাঝে তফাৎটা কোথায়। ক্ষেত্রফল
বলতে বোঝায় কোনো বাগান, ঘর, দেশ ইত্যাদির দ্বারা ভূমির কতটুকু অংশ দখল করা
হচ্ছে তার পরিমাণ। আপনার ঘরের মেঝে যতটুকু জায়গা দখল করছে - এটা আপনার ঘরের
ক্ষেত্রফল। দুই বিঘা জমি কবিতায় উপেনের দুই বিঘা জমি ছিলো - এটাও উপেনের
জমির ক্ষেত্রফল। মেট্রিক পদ্ধতিতে ক্ষেত্রফলকে 'বর্গমিটার' এককে প্রকাশ করা
হয়।
এবার আসি আয়তনে। আয়তন বলতে বোঝায় কোনো বস্তু
পরিবেশে কতোটুকু জায়গা দখল করছে। ধরাযাক, আপনার ঘরের মেঝের ক্ষেত্রফল 1
বর্গমিটার। কিন্তু, আয়তনের বেলায় ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উচ্চতা কতো,
সেটাও হিসাবে নিতে হবে। তখন এর একক হবে ঘনমিটার। সহজ করে বললে, একটা লুডুর
ছক্কার একপাশ হলো তার ক্ষেত্রফল, ঘরের মেঝে হলো তার ক্ষেত্রফল। কিন্তু
আয়তনের বেলায়, শুধু এক পাশ চিন্তা করলে হবে না। তখন উচ্চতাকেও গুণ দিতে হবে
ক্ষেত্রফলের সাথে। লুডুর ছক্কা লম্বা, চওড়া, উচ্চতা মিলে যতটুকু জায়গা দখল
করলো, সেটাই তার আয়তন।
আয়তন আর ক্ষেত্রফল সম্পর্কে তো জানা হলো। এবার আসুন কিছু ভুল ধারণা আর তার বিপক্ষে কিছু যুক্তি দেখা যাক।
[×] ভূল ধারণা ০১: আয়তন আর ক্ষেত্রফল তো প্রায় সমার্থক। এজন্যই ক্ষেত্রফলের বদলে আয়তন লেখা হয়েছে কি?
- না। আয়তন আর ক্ষেত্রফল শব্দ দুটো সমার্থক নয়। অন্ততপক্ষে গণিত আর বিজ্ঞানে তো নয়-ই! ওপরে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখে এসেছি আমরা।
[×] ভূল ধারণা ০২: একটা দেশ তো শুধু ভূমি নিয়েই হয়না। সাথে আকাশসীমাও থাকে। সেই আকাশসীমাকে সাথে নিয়েই বিষয়টাকে আয়তন বলা যায় না?
-
এর উত্তরও না। আয়তন বলতে বোঝায় তিনটি মাত্রার গুণফল, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর
উচ্চতা। এজন্য এর একক m³ বা ঘনমিটার। আমাদের বইয়ে একক হিসেবে আমরা
বর্গকিলোমিটারই দেখে এসেছি।
[×] ভূল ধারণা ০৩: আকাসসীমার উচ্চতা হিসেবে এক কিলোমিটার ধরা হয়। এজন্য নাকি ক্ষেত্রফল আর আয়তনের পরিমাণ বদলায় না।
এই
ধারণায় বড় রকমের একটা ভূল আছে। ভূমি থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত আকাসসীমা
বা বায়ুমন্ডলের উচ্চতা বিবেচনা করার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। আর, অযৌক্তিক
জিনিস অযথা আমরা পরিমাপ করবো কেন? আবার বায়ুমণ্ডলের প্রকৃত উচ্চতাকে গণণায়
নিয়ে আসাও ছাত্রছাত্রীদের জন্য ঝামেলার। বায়ুমন্ডলের ব্যাপ্তি নিয়ে অনেক
বিতর্ক আছে। তাছাড়াও যদি কোনো বিশেষ কারণে এক কিলোমিটারকে উচ্চতা ধরে আয়তন
বের করাই হতো, তাহলে আমরা একক হিসেবে ঘনকিমি দেখতে পেতাম। বর্গকিমি না।
[×] ভূল ধারণা ০৪: হয়তো… মাটির গভীরতাকে যুক্ত করা হয়?
এটা বেশ ভালো একটা প্রশ্ন। কিন্তু, এই ভ্রান্তধারণাকে "ভূল ধারণা ০২" এর যুক্তি দিয়েই ভাঙা যায়।
এবার
আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, এই সমস্যার তবে সমাধান কী? বলছি শুনুন। আয়তন
আর ক্ষেত্রফলের পুরো সমস্যাটাই আসলে একটা বড় রকমের অনুবাদজনিত ভুল। প্রথম
যখন কোনো এক অনুবাদক এই বিষয়ে লিখছিলেন, তিনি হয়ত 'ক্ষেত্রফল' শব্দটাকে ভুল
করে 'আয়তন' লিখে ফেলেছিলেন। আর, সেই ভুলটাই বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা!
বাংলাদেশের
ক্ষেত্রফল ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার। আয়তন নয়। আমাদের গণিত আর বিজ্ঞান বইয়ে
পড়া তথ্যগুলোই ঠিক। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে আমরা যা পড়েছি, তা একটা
অনুবাদজনিত ভুল।
আয়তন কথাটা যে এক্ষেত্রে ব্যবহার করা
অনুচিত - এই মেসেজটা আমাদের সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ঠিক যেভাবে নানা
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমাদের সমাজে যুক্তি ছড়িয়ে পড়েছে, সেভাবেই! আশাকরি
আমাদের পাঠ্যবইয়ে থাকা এতোবড় ভুল খুব তাড়াতাড়ি সংশোধন করা হবে।
এই
আর্টিকেলে আমি বোঝানোর স্বার্থে বাংলাদেশের ক্ষেত্রফল হিসাবে ১,৪৭,৫৭০
বর্গকিলোমিটারকে ব্যবহার করেছি। ছিটমহল অন্তর্ভুক্তির পর দেশের ক্ষেত্রফল
কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু, সেই সংখ্যাটায় আমরা কেউ অভ্যস্ত নই। সেকারণেই দেশের
পুরোনো ক্ষেত্রফল ব্যবহার করা। কমেন্ট বক্সে এই আর্টিকেলের পক্ষে কিছু
রিসোর্স দেওয়ার চেষ্টা করবো।